অনুবাদ

মুসলিমদের জন্য ক্রিটিক্যাল থিংকিং
মুসলিমদের জন্য ক্রিটিক্যাল থিংকিং
অনুবাদ করেছেন তারিকুর রহমান শামীম
১৫ এপ্রিল ২০১৬

এই প্রবন্ধটি হল ড তারিক রামাদান কর্তৃক প্রদত্ত একটি লেকচারের সারাংশ। তুরস্কের সাকারিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত 1st International Symposium on Critical and Analytical Thinking নামক একটি সিম্পোজিয়ামে তিনি এই লেকচারটি দিয়েছিলেন। লেকচারটি আদনান রায়হান আমীন তার ব্লগ Citizen of an Idiocracy-তে ইংরেজিতে অনুলিপি করেছেন। পাঠচক্রে সে অনুলিপির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হল।

ড রামাদান একজন সুইস একাডেমিশিয়ান, দার্শনিক, লেখক ও বিশ্লেষক। তিনি বর্তমানে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির কনটেম্পোরারি ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক। টাইম ম্যাগাজিন ও ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বের ১০০ জন শীর্ষ প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ১০০ জন শীর্ষ চিন্তাবিদের নামের তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই ভাষণে তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের মুসলিমদের জন্য ক্রিটিক্যাল থিংকিং এর দার্শনিক ও ঐতিহাসিক ভিত এবং ক্রিটিক্যাল থিংকিং এর বিশ্লেষণী কাঠামো নিয়ে আলোকপাত করেছেন। বক্তব্যের পরিচ্ছনতা, বোধগম্যতা ও ক্রমধারা রক্ষার্থে কিছু জায়গায় আমি সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো অনুবাদসহ যুক্ত করেছি এবং আমি আমার নিজের ভাষা ব্যবহার করেছি। যুক্তিগুলো যেভাবে সম্পর্কযুক্ত হয়েছে তাতে আমি খুব নগণ্য কিছু কাজও করেছি যেখানে চিন্তা, ধারনা ও যুক্তি সবই পুরোপুরি ড তারিক রামাদানের। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।

বিসমিল্লহির রাহমানির রাহিম

“নিশ্চই পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের পালাক্রমে যাওয়া আসার মধ্যে। যে সমস্ত বুদ্ধিমান লোক উঠতে, বসতে ও শয়নে সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর গঠনাকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তাদের জন্য রয়েছে বহুতর নিদর্শন। (তারা আপনা আপনি বলে ওঠেঃ) “হে আমাদের প্রভু! এসব তুমি অনর্থক ও উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে সৃষ্টি করো নি। বাজে ও নিরর্থক কাজ করা থেকে তুমি পাক-পবিত্র ও মুক্ত। কাজেই হে প্রভু! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের রক্ষা করো।” সুরা আলে ইমরানঃ (১৯০-১৯১)

 

১. মুসলিমদের জন্য চিন্তার বুনিয়াদ

এখনই সময় মুসলিমদের মাঝে ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার। যখন ক্রিটিক্যাল থিংকিং এর কথা বলা হয়, তখন এর পরিপূর্ণতা অর্জন করতে শুধুমাত্র মানবিক বিজ্ঞানের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা পর্যাপ্ত নয়। আমাদেরকে অবশ্যই নিজেদেরকে, আমাদের জাগতিক দর্শনকে, এবং আমাদের অস্তিত্বকে এর আওতায় আনতে হবে। একজন মুসলিমকে অবশ্যই ক্রিটিক্যালি চিন্তা করতে হবে; কোথায় যুক্তির সমাপ্তি হয় আর কোথায় বিশ্বাসের শুরু হয়। ইসলামী ক্রিটিক্যাল থিংকিংকে তার নিজস্ব বুনিয়াদ ও এর সক্রিয় কাঠামোকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। স্বাভাবিকভাবে কট্টর যুক্তিবাদীরা এই প্রতিজ্ঞাকে নিয়েই প্রশ্ন তুলে থাকেন। কিন্তু মুসলিম হিসেবে আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, আমাদের মৌলিক মতবাদগুলো বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত আর বাদ বাকি সবকিছুই সম্ভাব্য রূপে প্রশ্নের জন্য ও সমালোচনামূলক অনুসন্ধানের জন্য উন্মুক্ত।

একটি আন্তরিক ইসলামী বিশ্লেষণী দর্শন প্রকাশ করবে যে, আমরা দুইটা মাত্রা নিয়ে কাজ করছি, ক) বিশ্বাস খ) যুক্তিবাদ। মুসলিম হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি যে, সৃষ্টিকর্তা এক এবং কুরআন তার পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে। এটা হল মুসলিমদের জন্য শুরুর জায়গা। সাধারণত মুসলিমেরা মনে করেন যে, বিশ্বাস ও যুক্তির মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে বর্তমান যুগে মুসলিম ক্রিটিক্যাল থিংকিং এর গোটা ক্ষেত্রটা ইসলামের ধর্মীয় কাঠামো এবং আক্ষরিক চিন্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মূলত মুসলিমদের কাছে যে প্রাসঙ্গিক কাঠামোটি রয়েছে সেটা আসলে ইউরোপীয় দার্শনিকদের তৈরি কাঠামো।

যে নিরেট যুক্তিবাদ স্রষ্টার অস্তিত্ব, আসমানি কিতাব ও নবী-রাসূলদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সেটি নিজেই নিজেকে অমতবাদী চিন্তা হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু বাস্তবতা হল, অমতবাদীতার দাবী নিজেই একটা মতবাদ। এর মানে হল, দিন শেষে তার সত্যতা নিরূপন (মূল্যায়ন অথবা বিচার করার জন্য) এর একমাত্র উপায় হল বিচারবুদ্ধিতা ও বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন যুক্তি। এরূপ চিন্তার বদ্ধমূল ধারণা হলো, বিচারবুদ্ধিতাই হচ্ছে সত্যকে জানার একমাত্র মাধ্যম। পছন্দ করুন আর না করুন, এটা একটা মতবাদী অবস্থান।

মুসলিম দৃষ্টিকোণ থেকে ক্রিটিক্যাল থিংকিং আজ এই প্রশ্ন করা প্রয়োজন যে, আমরা কি নিরেট যুক্তিবাদের সাথে লড়ছি? সবকিছুই কি প্রশ্ন সাপেক্ষ, যার পরিণামে সবকিছুই আপেক্ষিক হয়ে যায়? যৌক্তিক চিন্তার কি কোন সীমা-পরিসীমা রয়েছে নাকি সবকিছুই প্রশ্ন সাপেক্ষ? এবং কোথায় বিশ্বাস ও যুক্তির আরম্ভ হয়? কিছু মানুষ আছে যারা বিতর্ক করার জন্য কোরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করতে চায় যে প্রশ্ন করাটা আমাদের কাজ নয়। তারা প্রায়শই উদ্ধৃত করে যে “আমরা নির্দেশ শুনেছি ও অনুগত হয়েছি। হে প্রভু! আমরা তোমার কাছে গোনাহ মাফের জন্য প্রার্থনা করছি। আমাদের তোমারই দিকে ফিরে যেতে হবে।” (সুরা বাকারাঃ ২৮৫)

মুসলিম সমাজের ভেতরেই এই বুঝ আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রশ্ন করা ঈমানের ঘাটতিকে ইঙ্গিত করে না। বিশ্বাসের ধারাগুলো প্রশ্নাতীত ভাবে গৃহীত হয়েছে কি হয়নি তার উপর ঈমানের গুণগত মান নির্ভর করে না। মূলত, গভীর প্রশ্নগুলো গভীর বিশ্বাস অর্জনে সাহায্য করতে পারে। এই দুইয়ের সাথে কোন দ্বন্দ্ব নেই।

মানুষ ধারণার একদম মর্মমূলেই বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা ও আধ্যাত্মিক ভাবনার যুগপৎ মিশ্রণ আছে। এই কাঠামোটিই মুসলিমদের ব্যবহার করা উচিত; প্রশ্ন করার খাতিরে সবকিছুকে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি কিংবা পশ্চিমা আরোপিত পদ্ধতিকে নয়।

 

২. একটি বিশ্লেষণী কাঠামো

ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের এরকম আলোচনাগুলোতে প্রায়শই একটি বিশেষ হাদিস চলে আসে। যখন রাসূল (স) মুয়ায ইবনে জাবাল (রা)-কে ইয়েমেনে পাঠাচ্ছিলেন, রাসূল (স) সেই সাহাবীর কাছ থেকে জানতে চাইলেন যে সেখানে তিনি কিভাবে উত্থাপিত বিষয়গুলো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

রাসূল (স): তুমি কিভাবে বিচার করবে?

মুয়ায (রা): আমি আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী বিচার করবো।

রাসূল (স): যদি আল্লাহর কিতাবে এ ব্যাপারে কিছু না থাকে তাহলে কি করবে?

মুয়ায (রা): তখন রাসূলের সুন্নাহ’র উপর ভিত্তি করে আমি বিচার করবো।

রাসূল (স): যদি সেটা রাসূলের সুন্নাহতেও না থাকে?

মুয়ায (রা): তখন আমি ইজতিহাদের (সুচিন্তিত মতামতের) ভিত্তিতে চেষ্টা করবো।

সূত্রঃ সুনান আত-তিরমিযি ১৩২৭, সহিহ

সুতরাং আমরা বুঝতে পারছি যে যখন কোন বিষয়ে ধর্মীয় গ্রন্থে পরিষ্কার কিছু পাওয়া যায় না কিংবা দিক নির্দেশনা স্পষ্ট নয়, তখন মুসলিমরা তাদের অন্তর দিয়ে উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাবে। কোন বিষয়ে উৎস সম্পর্কে খোঁজ খবর করা, বুঝা এবং প্রশ্ন করা ব্যতীত কেউ ভালো মুসলিম হতে পারে না। একজন অনুকরণশীল মুসলিম (অথবা মুকাল্লিদ, অনুগত শিষ্য) শব্দযুগলটি পরস্পর বিরোধী।

চলুন আমরা রাসূলের জীবনী থেকে আরেকটি ঘটনার দিকে তাকাই। বদর যুদ্ধের সময় মুহাম্মদ (স) এবং তার সহযোদ্ধারা প্রথম যে পানির কূপটি পেয়েছিলেন সেখানেই তাঁবু গাড়তে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু হুবাব ইবনে মুনযির (রা) মুহাম্মদ (স) এর সাথে সাক্ষাৎ করে যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইলেন। হুবাব জিজ্ঞেস করলেন যে সেখানে তাঁবু গাড়ার সিদ্ধান্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছিল নাকি এটা রাসূল (স) এর নিজস্ব কৌশল।

মুহাম্মদ (স) বললেন যে এটা তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। হুবাব ইবনে মুনযির রাসূল (স)-কে বললেন যে এটি ভালো সিদ্ধান্ত নয়। বিকল্প হিসেবে তিনি প্রস্তাব করলেন যে কুরাইশদের সবচেয়ে কাছের কূপগুলো দখলে রেখে অন্যগুলোকে অবরুদ্ধ করে রাখতে। মুহাম্মদ (স) মুনযির (রা)-এর সাথে একমত হলেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন।

রাসূল (স)-কে আপ্রোচ করার ক্ষেত্রে হুবাব ইবনে মুনযির তিনটি নীতি অনুসরণ করেছিলেন, প্রথমত, তিনি সিদ্ধান্তটির উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন দ্বিতীয়ত, তিনি সিদ্ধান্তটি বুঝতে এবং মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করলেন। তৃতীয়ত, পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজের দ্বিধা ও সংশয় দূর করতে প্রশ্ন করলেন।

বিশ্লেষণী কাঠামোঃ হুবাব ইবনে মুনযির (রা) এর তিন ধাপ

বিষয়বস্তু নমুনা প্রশ্ন
 

উৎস সন্ধান করা

 

কাজটি/সিদ্ধান্তটি কি ওহী থেকে প্রাপ্ত? যদি তাই হয়, তাহলে সেভাবেই গ্রহণ করা। যদি কেবল মানুষ থেকে আসে তাহলে কাজ/সিদ্ধান্তটি বিতর্ক সাপেক্ষ এবং প্রশ্ন সাপেক্ষ।

 

সিদ্ধান্ত বিচার বিবেচনা করা

 

সিদ্ধান্তটির যৌক্তিক ভিত্তি কি? কার দ্বারা এবং কিভাবে সিদ্ধান্তটি গঠিত হয়েছে? ওহীতে এই ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতির ব্যাপারে কি কোন সমর্থনে রয়েছে?

প্রশ্ন গঠন

 

এইটাই কি সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত? কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক না হয়ে এমন অন্য কোন উপায়ে সমাধান হওয়া সম্ভব যার মাধ্যমে এর চেয়েও উত্তম ফলাফল অর্জন করা সম্ভব?

 


ইবনে মুনযির রাসূল (স) এর দ্বীনের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করেননি, তিনি রাসূলকে মুসলিম উম্মাহর একজন যুদ্ধনেতা হিসেবে প্রশ্ন করেছিলেন। এটা হল সুক্ষ্ম পার্থক্য।

স্রষ্টার অস্তিত্ব, কুরআনের উপদেশ ও ভবিষ্যৎ বাণীগুলো বিশ্বাসের মধ্যে পড়ে। এগুলো সেইসব জিনিস যা আমরা বিশ্বাস করি। অন্যদিকে যখনি বিশ্বাসের ধারাগুলো স্মরণ, হস্তান্তরণ, লিপিবদ্ধকরণ এবং প্রচার করার ক্ষেত্রে মানুষের সম্পৃক্ততা এসেছে তখনই এগুলোকে অবশ্যই প্রশ্ন সাপেক্ষ হতে হবে। প্রায় সকল উল্লেখযোগ্য ইসলামী বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ- হোক সেটা শিয়া কিংবা সুন্নি- এই অবস্থান লালন করতেন যে যদি তাদের ব্যাখ্যা সঠিক হয় তাহলে যে কেউ সেটা গ্রহণ করার অধিকার রাখে। যদি তাদের ব্যাখ্যা ভুল সাব্যস্ত হয়, মানুষের সেটাকে প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রয়েছে। কোন ব্যক্তি বা দলের ব্যাখ্যা গ্রহণ করার ব্যাপারে এখানে কোন জোরাজুরি থাকতে পারে না।

মানুষের কাছ থেকে আসা বিষয়গুলোকে আইডিয়ালাইজ করা থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে মুসলিমদেরকে অবশ্যই খুব সতর্ক হতে হবে। সাহাবী, তাবেয়ী ও অন্যান্য মুসলিমদের মতামত ছিল, তারা যেভাবে ধর্মীয় গ্রন্থের বাণী বুঝেছেন তাদের ইতিহাস ও পরিস্থিতির একটা প্রভাব ছিল। তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত ছিল, অনেকটা যেরকম আমাদেরও দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত রয়েছে। সুতরাং অবশ্যই সে সকল দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যাখ্যা ও মতামতকে আদর্শে রূপ দেওয়া ও ঐশী বাণীর সমকক্ষ বানিয়ে ফেলা যাবে না। ইসলামের যেসকল বিষয় মানুষের মধ্য থেকে এসেছে সে সব কিছুকে প্রশ্ন করা প্রত্যেক মুসলিমেরই অধিকার ও কর্তব্য, এমনকি যদি সেটা রাসূল (স)-এর থেকেও হয়। কারণ দুনিয়াবি বিষয়গুলোতে মুহাম্মদ একজন মানুষ মাত্র ছিলেন। তার মতামত ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, উদাহরণ স্বরূপ কৃষিকাজে কিংবা মেডিসিনের কথাই ধরুন, এগুলো অবশ্যই নিবিড় পর্যালোচনা ও যাচাই বাছাই করেই গ্রহণ করতে হবে।

 

৩. ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতা

প্রথম ইসলামী বিজ্ঞান হল ফিকহ, যাকে ইসলামী আইন শাস্ত্রও বলা হয়। এই আইন শাস্ত্রে যুক্তির ভূমিকা খোঁজে বের করাটা একটা আকর্ষণীয় কাজ হবে। আমরা জানি, মুহাম্মদ (স)-এর সাহাবীরা ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে ভীত ছিলেন, পাছে তারা আবার সীমা লঙ্ঘন করে ফেলেন। মানুষও সব ফতোয়া গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ভীত ছিল। তারা রাসূলের হাদিস ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও ভুল হওয়ার ভয় করতেন, যেটা এখন দেখা যায় না। এমনকি এই আধুনিক সময়েও ফিকহের স্কলার ও শিক্ষকদের কাছ থেকে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাবি করা মুসলিমদের দায়িত্ব।

স্কলারদের মতামত অন্ধভাবে গ্রহণ করার পথ থেকে মুসলিমদের সরে আসা উচিৎ। তা না হলে, ব্যক্তি হবে একজন অনুসারী মাত্র, যিনি অন্যের মতামত ধার করে চলেন এবং প্রশ্নাতীতভাবে তা গ্রহণ করেন। একজন স্কলারকে পছন্দ করি বলেই তার সাথে একমত হওয়া আমাদের উচিৎ নয়। আমাদেরকে যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা উচিৎ, এটাই একমাত্র ধ্রুবক। স্কলারের উচিৎ উৎস সরবরাহ করা, যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা এবং প্রশ্নের উত্তর দেয়া। আর মুসলিমদের উচিৎ কিছু দার্শনিক মাপকাঠির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

  • পাঠের স্তর: টেক্সটগুলো কি ওহী থেকে প্রাপ্ত না কি মানুষের দ্বারা তৈরি? এগুলোর কি স্বীকৃত হস্তান্তরের ধারা (সনদ) রয়েছে? এগুলোর সত্যতা সম্পর্কে কি দৃঢ় আস্থা রাখা যায়?
  • মূল পাঠ: আয়াত ও হাদিসগুলো আসলে কি বলছে? কে এগুলোর অর্থ ব্যাখ্যা করেছে? এগুলোর আর কি কি সম্ভাব্য অর্থ রয়েছে?
  • বিষয়ের অগ্রাধিকার: বিষয়টি ইসলামের কতটুকু মৌলিকত্ব বহন করে? এটা কি অবশ্য কর্তব্য নাকি ঐচ্ছিক? এটা কি ইসলামী আক্বিদার অংশ? এটা কি আইনী ইস্যু?
  • জ্ঞানের প্রাসঙ্গিকতা: কোন পরিস্থিতিতে আয়াতটি বা বিবৃতিটি এসেছে? কে এটা বলেছে? কাকে বলেছে? কোন শহরে (স্থানে) বলা হয়েছে? সে সমাজ কেমন ছিল?
  • জ্ঞানের ইতিহাস: এটা কি হিজরতের আগে নাকি পরে? তখন কে ক্ষমতায় ছিল? তখন কি মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগ চলছিল? ৬ষ্ঠ শতাব্দীর আরবদের সামাজিক রাজনৈতিক প্রথা কি ছিল?

কোন বিষয়ের অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আজকের দুনিয়াতে মুসলিমদের বাহ্যিক দৃষ্টিগোচরতার প্রতি বেশি জোর দেয়া হয়। তার কি দাড়ি আছে? সে কি টুপি পড়ে? তার চুল ও বাহু কি ঢাকা আছে? কিন্তু ইসলামে মানুষ আপনাকে কিভাবে দেখে সেটা কোন ব্যাপারই না। স্রষ্টা কিভাবে আপনাকে দেখছেন সেটাই আসল কথা।

মুসলিমদের মনযোগী হতে হবে যে মুসলিম বিশ্বের মধ্যেই একটি মতৈক্য তৈরির রাজনৈতিক প্রচেষ্টা বিদ্যমান রয়েছে। এমন মাত্রায় যে ইসলামের এক পাক্ষিক ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অনেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতকে রক্ষা করার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠের নীতি সম্পর্কিত হাদিসের প্রতি নির্দেশ করেনঃ

“আমার উম্মত কখনই ভুলের উপর একমত হবে না।"

রাসূল (স) মুসলিম উম্মাহর মধ্যে মতৈক্যের ওপর নির্ভর করেছেন এই জন্য নয় যে এর দ্বারাই মুসলিমদের মাঝে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, বরং এর মাধ্যমে তাদের ব্যাপারে আশা করা হয়েছে যেন তারা সবসময় ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের চর্চাতে নিয়োজিত থাকে, কঠিন কঠিন প্রশ্ন করতে পারে, বিভিন্ন দিক মূল্যায়ন করতে পারে এবং অবশেষে ভালো একটি সমাধানে পৌঁছতে পারে।

 

৪. স্বীকৃত ভিত্তিকে শক্তিশালী করা

একদিকে সেক্যুলার তথা ইহজাগতিকতাবাদী ধারণা ও পরিভাষাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কিন্তু অন্যদিকে ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে তা এড়িয়ে যাওয়া ন্যায্য কাজ নয়। ইসলামী স্কলার, মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও মানবিক বিজ্ঞানে দক্ষদের মাঝে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি হচ্ছে সংজ্ঞা ও পরিভাষা কেন্দ্রিক। এবং এই প্রতিবন্ধকতাটি আরবি থেকে অন্য ভাষায় ভাষান্তর করার প্রতিবন্ধকতা নয়। বরং আমরা জানতে চাই যে কিভাবে এই ধারণা ও পরিভাষাগুলো আরবিতে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে?

শুরুতেই ইসলাম আসলে কি সে ব্যাপারেই আমরা ঐক্যমত্য নই। কেউ বলেন ইসলাম হল একটা ধর্ম, অন্যরা বলেন এটা হল জীবন বিধান। এখানে তারাও আছেন যারা ইসলামকে সভ্যতা হিসেবে ধারণা করেন আবার এমনও আছে যারা বলেন জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার সবকিছুই হল ইসলাম। যদি আমরা ইসলামের অর্থ করি “আত্মসমর্পণ” তাহলে সেটা কি ধর্মের সর্বোচ্চ ধারণাকে আলোকপাত করে? শান্তির ধারণার মাধ্যমে কি ব্যক্তির শান্তি, সৃষ্টির সাথে শান্তি, এবং স্রষ্টার সাথে শান্তি এই পরিভাষাতে বুঝানো যাচ্ছে? প্রাচ্যবাদীদের অনুদিত ইসলামকে গ্রহণ করার মাধ্যমে আমরা দুনিয়ার কাছে নিজেদেরকে ক্রিটিক্যালি উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

শারীয়াহর ব্যাপারে চিন্তা করে দেখুন। শারীয়াহ কি? কারা শারীয়াহকে সংজ্ঞায়িত করছে? সুফি আধ্যাত্মিকদের একটা সংজ্ঞা আছে। ষোড়শ শতাব্দীতে ভারতবর্ষ আইন ও আধ্যাত্মিকতার সামঞ্জস্য বিধান প্রত্যক্ষ করেছে। আজকের মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব হচ্ছে ইসলামী সংজ্ঞা এবং পরিভাষাগুলো কি বুঝায় সে বিষয়ে একটা ঐক্যমত্যে পৌঁছা। আর এ কাজটা পশ্চিমাদেরকে ইসলাম বুঝাবার উদ্দেশ্যে করা নয় বরং এটা এজন্য করা উচিৎ যে আমরা আসলে কি বলছি তা আমরা নিজেরাই জানি না।

জিহাদ ও খিলাফতের সংজ্ঞা কি? এগুলো ইসলামের সামগ্রিক প্রকৃতিকে প্রতিফলিত করে। কিন্তু আমরা যতক্ষণ এগুলোকে আমাদের বর্তমান অভিজ্ঞতা ( উদাহরণ স্বরূপ: সিরিয়া ও ইরাকের যুদ্ধ) এর আলোকে ব্যাখ্যা করি, তখন আমরা কিন্তু ক্রিটিক্যালি চিন্তা করছি না। গত ২০০ বছর ধরে আমরা ইজতিহাদের ব্যাপারে বলছি। ইজতিহাদ নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে, কিন্তু তাতে ফল এসেছে খুব কমই। আজকে আমরা আধুনিক বিশ্বের বিচ্ছিন্ন কিছু ইসলামী সংস্করণ হাজির করেছি, যেমন ইসলামি অর্থনীতি ও ইসলামী অর্থায়ন বলে দিচ্ছে কিভাবে মুসলিমরা আধুনিক বিশ্বের সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। কিন্তু ইজতিহাদ হল সমাজ ও বিশ্ব বিনির্মাণের বিষয়, নিতান্তই খাপ খাইয়ে নেয়া নয়।

 

৫. ইসলামী ধর্মতত্ত্ব এবং ইসলামী বিজ্ঞান

আরেকটি বিষয় হল বিজ্ঞানকে আমরা যেভাবে শ্রেণী বিভাগ এবং স্তর বিন্যাস করেছি। এটা নিয়ে চিন্তা করুন: প্রথমেই আমাদের আছে কুরআন ও কুরআনের জ্ঞান। এরপর আসে হাদিস এবং হাদীসের জ্ঞান। এরপর আমাদের ফিকহের নীতিগুলো (উসূল আল ফিকহ) আছে, এবং আছে ফিকহ। এর পর কিছু সুফি জ্ঞান (ইলমে তাসাউফ), নীতিশাস্ত্র (ইলমে আখলাক)। এ হল জ্ঞানের শাখা সমূহ, এগুলো কোত্থেকে এসেছে? এগুলো কি কুরআনে আছে? না এগুলো কুরআনে নেই। এগুলো কি হাদিসে আছে? না এগুলো হাদিসে নেই।

উত্তর হল যে এগুলো মানুষের উদ্ভাবন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শুরুতে ইসলামী বিজ্ঞানের প্রসঙ্গে বলা হয়েছিল। আমাকে এটি প্রশ্ন করার সুযোগ দিন, ইসলামী বিজ্ঞানে “ইসলামী” জিনিসটা আসলে কি? বিষয়বস্তুটা কি ইসলামী? নাকি পদ্ধতিটা ইসলামী?

যদি আমাদের এমন বিজ্ঞান থেকে থাকে যাকে "ইসলামী" বলে চিহ্নিত করা যায়, তাহলে আমরা জানি আমাদের সেই ঐশী বিজ্ঞান রয়েছে- যে জ্ঞানটা বিশ্বাসের জগত নিয়ে কাজ করে। কিন্তু এটা সমস্যাপূর্ণ ব্যাপার। এখানে প্রশ্ন আসে, ফিকহটা কোথায় থাকবে? ফিকহ বা আইন হল মানুষকে রক্ষার ক্ষেত্রে বিবেচ্য, আর আইন প্রণয়ন করা হয় মানুষের মতামতের ভিত্তিতে। তারমানে কি একজনের মতামত ঐশী হতে পারে? এটা অযৌক্তিক, আমাদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং কাঠামোর সাথে এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বর্তমান সময়ে ইসলামের মূল বিজ্ঞান দাঁড়িয়েছে ফিকহ। হালাল এবং হারামের বিধান। সংশ্লিষ্ট আলিম আপনাকে বলছেন যে পূর্ব নির্ধারিত নীতি অনুযায়ী কোনটা কোনটা চলে আর কোনটা চলে না। কিন্তু আইনের দার্শনিক কাঠামোটাই হওয়া উচিৎ মূল বিজ্ঞান। আমাদের সেটা নেই। আমাদের শুধুমাত্র কিছু আইনি (ফিকহী) ব্যাখ্যা রয়েছে। কিন্তু মুসলিম জীবনের অন্যান্য বিষয়গুলোগুলোতে দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কোন বিজ্ঞান হাজির নেই।

ইসলামের প্রাথমিক সময়ে, স্কলাররা তাদের চিন্তা-ধারার ব্যাপারে উন্মুক্ত ছিলেন। এর মানে হল তারা বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাগুলোর ব্যাপারেও উন্মুক্ত ছিলেন। সুতরাং ইসলামের সাথে সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিজ্ঞানের কোন সমস্যাই ছিল না। কিন্তু যেহেতু আজকের মুসলিমরা রক্ষণাত্মক, হালাল-হারামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং এইটাই তাদের মূল বিজ্ঞান হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেহেতু সব কিছুর সাথেই ধর্মীয় স্কলারদের কাছ থেকে ফতোয়া চাওয়া হচ্ছে এবং কোন ক্রিটিক্যাল থিংকিং এখানে অন্তর্ভুক্ত নেই। এইভাবে, ফতোয়াকে দর্শনের আগে প্রাধান্য দেয়ায় আমরা ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোতে উলট পালট করে ফেলেছি।

 

৬. ক্রিটিক্যাল থিংকিং এর নীতি সমুহ

মুসলিম বিশ্ব, তুরস্কের জনগণসহ, পাশ্চাত্যের দ্বারা প্রভাবিত। এমন কি তারা যেভাবে প্রশ্ন করে সেটাও। প্রশ্ন করার শক্তিটা আমাদেরকে পুনরুদ্ধার করতে হবে যার মাধ্যমে আমরা আমাদের জ্ঞানকে বৃহত্তর কল্যাণের জন্য ব্যবহার করতে পারি। পাশ্চাত্যের জনপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানুষজন ক্রিটিক্যাল থিংকিংকে একাডেমিয়ার সরু কাঠামোর ফাঁদে ফেলতে অনেক উচ্চতর চিন্তা করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যই হল মানুষের সেবা করা। সেজন্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন চিন্তাবিদ হিসেবে নিজেদের তৈরি করা আমাদের কাজ নয়। মুসলিম চিন্তাবিদের উচিত সমাজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া এবং নিয়োজিত থাকা। "এক্টিভিস্ট স্কলার" না হয়ে শুধু স্কলার হওয়া সামাজিক কোন উদ্দেশ্য সাধন করে না। এই দোয়াটির দিকে তাকান, “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কার্যকরী জ্ঞানের জন্য প্রার্থনা করি”। আপনার জ্ঞানকে কার্যকরী করুন। এভাবেই আমরা সৃষ্টিকে সেবা করতে পারি। এবং এটা আমাদের স্কুলে থাকা থেকেই শুরু করতে হবে। ছাত্র/ছাত্রীদেরকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হবে। যেন তারা শুধু মুখস্থ করে বসে না থাকে বরং এর অর্থও যেন তারা অন্তঃকরণ করে এবং সমাজের কল্যাণের জন্য তা ব্যবহার করে।

জ্ঞান উৎপাদনের আলোচনার সময় এর চূড়ান্ত গন্তব্য তথা ক্ষমতার উৎপাদন ও বন্টন সম্পর্কে আলোকপাত করা জরুরী। ইসলামী বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখুন, কারা মুসলিমদের পক্ষে কথা বলছে? বিজ্ঞানের কোন শাখায় ইসলাম বিষয়ে কথা বলার মতো কর্তৃত্ববান লোক আছে? যদি ডাক্তারি বিদ্যায় কোন সিদ্ধান্তের দরকার হয় তখন কে ফায়সালা দিতে পারবে? সম্ভবত একজন শায়খ। কিন্তু একজন ধর্মীয় গুরু ডাক্তারি সম্পর্কে কি জানেন? কিভাবে আমরা বিজ্ঞানের সাথে ইসলামের মেলবন্ধন করবো? ইসলামে আমরা এরকম বিজ্ঞের অনুপস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। হ্যাঁ বিচ্ছিন্নভাবে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শক্তি ও কর্তৃত্বের কিছু কেন্দ্র রয়েছে। এর মানে হচ্ছে মুসলিমরা শিখছে এবং সঞ্চারিত করছে ভালই কিন্তু তারা ইসলামের দর্শনের প্রকৃতি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এক্ষেত্রে দ্বিতীয় মাত্রাটি হল "উম্মাহ" এর ধারণার সাথে আমাদের বুঝ ও এর মূল্যায়ন এবং কিভাবে তা সারা বিশ্বের সাথে সম্পর্কিত তা নির্ধারণের প্রশ্ন। আমাদের চিন্তার উৎসটা কি? আমাদের কি অর্থনীতি, সমাজনীতি ও পদার্থবিদ্যা প্রণয়ন করতে হবে না? এটা এমন নয় যে মুসলিমরা শুধুই ঐশী জ্ঞান কে গ্রহণ করে আর অন্যান্য শাখাগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে। মুসলিম ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ে সকল বিজ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মানুষ ইসলামকে বুঝতে গিয়ে নিজস্ব উদ্ভাবিত যেসব উপাদানসমূহ যোগ করেছে সেগুলোকে অবশ্যই সাম্প্রতিক জ্ঞানের আলোকে প্রশ্ন করতে হবে, চ্যালেঞ্জ করতে হবে।

ইসলামের ইতিহাসে অনেক সাহসী স্কলার ছিলেন। অষ্টম শতাব্দীর সময়েও স্কলাররা ধর্মত্যাগের কারণে রক্তপাতের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছিলেন (হিকমাল রিদ্দাহ)। অনেকে উল্লেখ করেছেন যে রাসূল (স) কখনই ধর্ম পরিবর্তনের কারণে কাউকে হত্যা করেননি। এবং আমরা যদি তাকে একজন মুসলিমদের সবচেয়ে নির্ভুল প্রতিনিধি হিসেবে মনে করি তাহলে কোন ভাবেই ধর্ম ত্যাগের কারণে মৃত্যুদন্ড হতে পারে না। এখনকার সময়ে অনেকেই সুফিয়ান আস সাওরির চিন্তাধারাকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন, এবং তার ইসলাম ব্যাখ্যায় আরও বেশি যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেন।

এধরনের স্কলার সম্ভবত সংখ্যায় কম ছিলেন। কিন্তু কিভাবে আমরা বুঝব যে সত্য সংখ্যাগরিষ্ঠের সাথেই আছে? যে মতামত শক্তভাবে ঐশী গ্রন্থ এবং দ্বীনের প্রথার মধ্যে শিকড় গেড়ে থাকে তা যেকোন দুর্বল উৎসের উপর প্রতিষ্ঠিত ঐক্যমত্যের চেয়েও ভাল। আমাদের সরকার ও আমাদের দ্বারা নির্বাচিত নেতাদের ব্যাপারে চিন্তা করুন। প্রায়শই তারা এসব দায়িত্বের জন্য সর্বোত্তম ব্যক্তি হয় না। কিন্তু এটা সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দ। ক্রিটিক্যাল থিংকিং হল সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের গতিরোধ করে দাঁড়ানো, সবার আগে প্রশ্ন ও যাচাই করে তারপরে কোন মতামতকে গ্রহণ করা।

এখানে ইসলামের সকল বিষয়ে একজন স্কলারের সকল ব্যাখ্যা ও মতামত মেনে নেয়ার মাধ্যমে স্রেফ অনুকরণশীল (মুক্বাল্লিদ) হয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। একজন মুক্বাল্লিদ দলিল জানা ছাড়াই মতামত গ্রহণ করেন। এভাবে মুসলিমদের এটাও একটা দায়িত্ব যে, কোন স্কলারের মতামত গ্রহণ করার আগে তার নিয়মানুযায়ী মূল্যায়ন করা। কেউই আপনার হয়ে চিন্তা করতে পারে না।

এর মানে এই নয় যে ইতিহাসে যত মুসলিম স্কলার আছেন তাদের এবং তাদের সব শিক্ষাকে বাজেয়াপ্ত করতে হবে। অধিকন্তু মুসলিম চিন্তকদের অবশ্যই অতীতের স্বনামধন্য স্কলারদের মতামত পুনরায় জানতে হবে, এবং সেগুলো পরিভ্রমণ করতে হবে। আবু হামিদ আল গাজ্জালীর উদাহরণই ধরুন। আমাদেরকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে গাজ্জালীর মতো বড় স্কলারও তার সময়ের মানুষ ছিলেন এবং তার সময়ের চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। পুরুষ এবং মহিলার মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারে তার ধ্যান ধারনা যেমন "পুরুষ হচ্ছে অধিপতি এবং নারী হচ্ছে তার দাসী" স্রেফ অগ্রহণযোগ্য। ইসলামের কোন সংস্কার হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের চিন্তা পদ্ধতিতেই কেবল একটা বিপ্লব দরকার।

 

৭. ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব’র সমালোচনা

মুসলিমদের চিন্তাগুলোকে অবশ্যই তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের অংশ হতে হবে। কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করা মুসলিমদের জন্য খুবই দরকার। মুসলিমরা বিশ্বজুড়ে বিশ্বাসের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এবং ইসলামকে বিশ্বে কিভাবে অনুশীলন করা হচ্ছে সে প্রশ্নে আমাদের আহবানকে পুন-নবায়ন করতে হবে। ইসলামী সিদ্ধান্তসমূহ কিভাবে নেয়া হচ্ছে? কারা মতামতগুলো প্রদান করছে? এই সিদ্ধান্ত সমূহ নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত দলিল সমূহের পরিমিত মানগুলো কেমন? আমরা যদি এসব না জানি তাহলে রাজনীতিবিদেরা ক্ষমতার এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য চেষ্টা করবে এবং অযোগ্য স্কলাররা তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা চালিয়ে দিয়ে উম্মাহর প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার প্রয়াস পাবে।

ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের আলোচনা হল জটিল বিষয়। আমরা এসব পছন্দ করি না, বিশেষ করে যখন এখানে ধর্মীয় কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে আসে। সউদী আরবের সালাফি আক্ষরিকবাদীরা বলে “হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের আর সেই সব লোকের যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী” (সুরা আন নিসাঃ ৫৯)। এই আয়াতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা প্রশ্ন করাকে নিরুৎসাহিত করে। এবং তারা বলে “রাজনীতি করো না”। অথচ এটাই সবচাইতে বড় রাজনৈতিক বক্তব্য। মুসলিম সমাজে ক্রিটিক্যাল থিংকিং এবং প্রশ্ন করার সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করতে এভাবে ঘুরিয়ে বলা হয়।

যখন স্কলাররা এই আয়াতটি উদ্ধৃত করেন, “তিনিই মহান সত্তা যিনি উম্মীদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন যে তাদেরকে তাঁর আয়াত শুনায়, তাদের জীবনকে সজ্জিত ও সুন্দর করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়। অথচ ইতিপূর্বে তারা স্পষ্ট গোমরাহিতে নিমজ্জিত ছিল।” ( সুরা জুম’আ আয়াত ২) – তারা হিকমাহ (প্রজ্ঞা) শব্দটিকে সুন্নাহ অর্থ করেন। কিন্তু এটা একটা আইনি পাঠ। স্বভাবতই হিকমাহ একটি বিশদ জাগতিক দর্শন, যার মধ্যে সকল জ্ঞানই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, এমনকি বিজ্ঞানসহ। ঐশী বাণী হচ্ছে প্রজ্ঞা আহরণের জন্য, শুধুমাত্র ফিকহী হুকুম আহকামের জন্য নয়।

মুসলিম হিসেবে আমরা যেন এমনভাবে ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ে ঝাঁপিয়ে না পড়ি যেন এটা শুধু যুক্তির মাধ্যমেই অনুশীলিত হতে পারে, যাতে আধ্যাত্মিকতার কিছু নেই। নিজেকে মূল্যায়ন করা দিয়ে শুরু করুন। আপনি কি নিজেকে সম্মানিত করছেন? আপনার ব্যবহার কি ন্যায়সঙ্গত? চিন্তা করুন ঠিক কতটুকু মাত্রায় আমরা আল্লাহকে মানছি আর কতটুকু নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার করছি।

 


লেকচারের ভিডিও লিংকঃ Dr Tariq Ramadan: The Importance of Critical Thinking for Muslim Societies both in the West and East

তারিকুর রহমান শামীম