অনুবাদ

মুসলিম বিশ্বে খেয়ালি মানচিত্র তৈরীকারী সাইকস পিকো'র ১০০ বছর পার হল
মুসলিম বিশ্বে খেয়ালি মানচিত্র তৈরীকারী সাইকস পিকো'র ১০০ বছর পার হল
অনুবাদ করেছেন রাইফ ইফতিখার
৩০ মে ২০১৬

 

সালমান সাইদ (লিডস ইউনিভার্সিটির প্রফেসর)

অনুবাদঃ রাইফ ইফতিখার

সাইকস- পিকোচুক্তিকে মূলত ওসমানী সাম্রাজ্যের শেষ সময়ে, কোন বিশ্বাসযৌগ্য ও বৈধ উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি ছাড়াই সাম্রাজ্যের সত্যিকারের হুকুমাতের অনুপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় এবং  ইউরোপীয় শক্তির দ্বারা ইউরোপের বাইরের বিশ্বব্যাবস্থায় চূড়ান্ত হস্তক্ষেপের যে অধ্যায়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সাইকস-পিকোচুক্তির ইতিহাস 

১৯১৬ সালের ১৬’ই মে,  প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্রিটেন ও ফ্যান্সের মধ্যে একটি গোপন চুক্তি হয়। যুক্তরাজ্যের “মার্ক সাইকস” এবং ফরাসি “ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকট” নামের দুজন অখ্যাত কূটনৈতিক তাদের নিজ নিজ সরকারের অনুমোদনক্রমে , যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মাঝে ওসমানী সাম্রাজ্যের এলাকাগুলোকে নিজ নিজ প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসার জন্য মানচিত্র ভাগাভাগির পরিকল্পনায় একমত হন ।এই লক্ষ্যে ‘পারস্যের সীমান্ত থেকে মেডিটেরিয়ানের পূর্ব পর্যন্ত’ একটি কল্পিত সীমারেখা অঙ্কন করা হয়, যার ‘দক্ষিণভাগের’ নিয়ন্ত্রন থাকবে যুক্তরাজ্যের হাতে এবং ‘উত্তরের’ নিয়ন্ত্রণ থাকবে ফরাসিদের হাতে । চুক্তি অনুসারে উভয় পক্ষ তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় “ নিয়ন্ত্রণকারী জনবল কিংবা উপদেষ্টা” নিয়োগ দিতে পারবে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার “ নিজস্ব বাণিজ্য প্রসার এবং ঋণ প্রদানের” প্রতি বিশেষভাবে আলোকপাত করবে । বিশেষত, চুক্তি অনুসারে ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য তাদের নির্ধারিত এলাকায় “আবশ্যিকভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ‘প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা’ করবে, এবং এই লক্ষ্য অর্জনে অবস্থা বিশেষে নিয়ন্ত্রিত এলাকার ‘আরব রাষ্ট্র বা আরব রাষ্ট্রীয় কনফেডারেশনের’ গুলোর সাথে মিলিত ভাবে কাজ করবে” যাকে অবশ্যই; দুই পক্ষের মিলিত উদ্যোগ দ্বারা “স্বীকৃত ও সুরক্ষিত” হতে হবে । পরবর্তীতে এই চুক্তিটি ‘রাশিয়ান’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী “সারগেই সাজোনভ’’ এর উপস্থিতিতে , রুদ্ধদ্বার সভায়  অনুমোদিত হয় ।  ব্রিটিশ ও ফরাসি দাবির গ্রহণযোগ্যতা বিনিময়ে, রাশিয়া ‘কনস্টান্টিনোপলে’ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং “ওসমানী সাম্রাজ্যে”র বাইরের অন্যান্য অঞ্চলে প্রবেশের অনুমোদন পাবে ।

 

 

“সাইকস-পিকোচুক্তি“তে রাশিয়ার ‘জারপন্থি সরকার’ অপেক্ষাকৃত ‘কম গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ’ হিসেবে ছিল। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালের অক্টোবরে রুশ বিপ্লবে জার “দ্বিতীয় নিকোলাসে”র পতনের পর ‘বলশেভিকরা’ চুক্তিটি প্রকাশ করে। ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধে’র অবসানের পরবর্তী ‘ওসমানী শাসনামল’ নিজেদের শেষ প্রহরের সঙ্গিন অবস্থায় ‘সাইকস-পিকোচুক্তি’র প্রতিবাদে খুব বেশী উচ্চ্যবাচ্য করেনি যেখানে, ‘মসুলকে’ ‘ইরাকের বদলে সিরিয়ায়’ স্থান দেয়া হয়েছিল ।

 

কেন সাইকস-পিকোচুক্তি বর্তমান দুনিয়ায় সমান প্রাসঙ্গিক ?? 

 

এই চুক্তির গুরুত্ব এবং তার আজ প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে একটি দিকনির্দেশক ও উল্লেখযোগ্য পাণ্ডিত্যপূর্ণ   বিতর্ক বরাবরই চলমান ছিল এবং আজ পর্যন্ত বর্তমান রয়েছে। এই চুক্তির পর সবমিলিয়ে ১০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে । এই দীর্ঘসময়ে বিশ্বব্যাপী এমন অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, অবশ্যম্ভাবী ভাবেই তাদের অনেক ঘটনাই এই চুক্তির উদ্দেশ্য ও ঘটনাপ্রবাহের সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত । এই চুক্তির তার্কিক বিশ্লেষণ ছাড়াই সরল সমীকরণে বলা যায়’যে , ‘একশ বছর আগের দুই অখ্যাত কূটনৈতিকের ঐক্যমতে স্বাক্ষর করা এই চুক্তি’টি তার প্রতীকী গুরুত্বকে ছাড়িয়ে নতুন বিশ্ব পরিস্থিতিতে নিয়ত প্রাসঙ্গিকতায় রূপান্তরিত হয়েছে । এটিই হয়তো “সাইকস-পিকোচুক্তি”র প্রতীকী সক্ষমতা । যা ‘সাইকস’ ও ‘পিকটে’র মৃতদেহের ‘ভূত’ হয়ে তাদের পরিকল্পনার ‘মৌলিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে’ আমাদের কাছে কুখ্যাতি অর্জন করেছে ।

 

প্রথমত, “সাইকস-পিকটের পরিকল্পনা”কে মূলত এমন একটি সময়ের ঘটনাবলীর অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যখন ইউরোপ নিজেই তার অঞ্চলের বাইরের বিশ্বে; নিজের শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে  বিশ্ব-মানচিত্রকে নিজেদের সস্তা-বাস্তবতাবিবর্জিত, কল্পিক ধারণা অনুসারে আঁকতে চেয়েছিল । ১৪৯৪ সালে স্পেন ও পর্তুগালের রাজার মাঝে স্বাক্ষরিত “ ত্বরদেসিলাস চুক্তি”কে এই ধরনের পদক্ষেপের শুরুর উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে ; অথবা ১৮৮৪ সালের “বার্লিন কনফারেন্স”, যা আফ্রিকায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের বিধিবদ্ধ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। সব ক্ষেত্রেই ইউরোপের কল্পিত ‘মানচিত্রকে’ই নিয়ামক হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছে। এই মানচিত্রগুলোতে ঐ অঞ্চলের ‘প্রাকৃতিক সীমানা’ বা ‘ঐতিহাসিক বন্ধন’ প্রায়ই  শুধুই একটি জ্যামিতিক নীতি, যা ‘পেন্সিল’ কিংবা ‘কম্পাসে’র ঘূর্ণিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। “সাইকস পিকোচুক্তি” মূলত ‘ইউরোপে’র দ্বারা “ওসমানী সাম্রাজ্যে”র উপর বিজয়ীর ছড়ি ঘোরানোর পরিকল্পনা ছিলনা, বরং এটি ছিল ধারাবাহিক অসম চুক্তি,ধারা কিংবা নিয়মের বন্ধনী, যার মাধ্যমে ইউরোপের বাইরের শক্তি গুলোকে বিভিন্নভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা যেতো । এই চুক্তি ‘ইউরোপীয়ান শক্তি’র চূড়ান্ত শক্তিমত্তা প্রদর্শনশক্তির পরিচায়ক। মনে রাখা দরকার যে, এই চুক্তির মাত্র পাঁচ বছরের মাঝে ‘যুক্তরাজ্য’ স্থানিক বিচারে সবচেয়ে বেশী এলাকায় নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় ।

               

দ্বিতীয়ত, “সাইকস-পিকোচুক্তি” শুধুই সীমানার বিভাজনের ‘অনর্থক রাজনীতি’ ছিলনা । এটি ছিল ওসমানী জগতের ‘বিশ্বজনীন বাস্তবতাকে’ সরিয়ে, ‘সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ’ ও ‘বিদেশবিমুখিতার’ মাধ্যমে ‘নতুন পৃথিবী রূপান্তরের’ একটি হীন চেষ্টা । ওসমানী সাম্রাজ্যকে বরাবর দুভাগ করার মত ‘অপরিণামদর্শী’ পদক্ষেপ, শুধুই ইঙ্গ-ফরাসি শক্তির সাথে সম্পর্ক বিনিময়ের মাধ্যমে কিছু ব্যাক্তির ‘ক্ষমতা’ ও ‘বিশেষাধিকার অর্জনের’ উদ্দেশ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত, সংশ্লিষ্ট এলাকায় মহাজন-খরিদ্দার ধরনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার একটি ‘রূপরেখা’ হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে। যাতে, ‘স্থানীয় শাসকগন’ এই রূপরেখায় তাদের নিজস্ব অধিকৃত এলাকায় ‘তেল উত্তোলনে’ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার নিজের এলাকার জনগনকে ঠকিয়ে বিদেশী শাসকদের খুশী করতে পারে। এই অবস্থা এখনো ‘ভিন্ন পোশাকে’ চোখে পড়ে যখন ‘ইউরোপের রাজধানীগুলো’তে, তেল থেকে অর্জিত সম্পদগুলো জনপদের ‘সার্বভৌমত্ব’ ও ‘জবাবদিহিতাকে’ মাড়িয়ে তাদের ‘পশ্চিমা প্রভুদের অনুগ্রহ’ কিনতে ব্যায় করা হয় । অন্যকথায়, ক্ষমতাসীন শাসকেরা তাদের নিজ জনগনের চেয়ে ‘পশ্চিমা প্রভুদে’র সাথে সম্পর্কে অধিক পারঙ্গম। সুতরাং, “সাইকস- পিকটের” ইতিহাস, শুধুই এই অঞ্চলে ‘দালালবৃত্তির’ ইতিহাসের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেনা, এটি এই ‘মহাজনি-খরিদ্দার’ ব্যাবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকতাকেও শরবিদ্ধ করে।    

 

তৃতীয়ত, “সাইকস- পিকোচুক্তি” মূলত “ওসমানী সাম্রাজ্যে”র কোন ‘বিশ্বাসযৌগ্য’ ও ‘বৈধ উত্তরাধিকারী’র অনুপস্থিতিকে মনে করিয়ে দেয় । এছাড়াও,ঐ অঞ্চলের ‘স্থানিক বিভক্তি’র মাধ্যমে কোন ‘কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ’ ছাড়াই ‘শাসক’ ও ‘শাসিতে’র মধ্যকার অচলাবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে সাইকস- পিকো ‘স্বায়ত্তশাসন’ ও ‘সমৃদ্ধি’ আনতে অক্ষম, ‘অকার্যকর ও অনুপস্থিত’ এক রাষ্ট্রের চূড়ান্ত পরিণতিকে নির্দেশ করে । সাইকস-পিকোটেকসই ‘স্বাধীন সার্বভৌমত্ব’ প্রয়োগ করিতে সক্ষম ‘রাষ্ট্রে’র অনুমতি দেয় না। এটি ‘ইঙ্গ-ফরাশি অভিপ্রেত’ এমন একটি ‘রাষ্ট্রব্যাবস্থার কল্পনা’, যার মাধ্যমে ইঙ্গ-ফরাসি ‘স্বার্থ, প্রভাব এবং পরোক্ষ শাসন’ প্রয়োগ করা যেতে পারে । এটাই সেই সত্যিকারের ঘর, যা ‘সাইকস- পিকট’ তৈরি করেছিলেন, যার ছাদের নিচে এখনো এই অঞ্চলের ‘জনগন’ বসবাস করছে । সুতরাং যদিও সে বাড়ির ‘স্থাপত্যবিদ’ সর্বস্বান্ত হয়, যেমন ‘ফরাসি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য’ তাদের নিজেদের ছায়া হয়ে রয়েছে, এবং বাড়ির নতুন মালিক, যারা ‘ওয়াশিংটন বা মস্কো’ হতে এসেছে, তারাও এই স্থাপত্যকে ব্যাবহার করে নিজস্ব স্বার্থ হাসিল করতে চায়। কিন্তু সত্যিকারের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ জনগন । ‘সাইকস-পিকোচুক্তি” মূলত “ওসমানী সাম্রাজ্যে”র অনুপস্থিতিতে তারস্থলে একটি ‘মনিবের ঘর’ নির্মাণের পরিকল্পনার মত । ঔপনিবেশিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আজ সারা ‘বিশ্বজুড়ে’ এই ধরনের ঘরগুলো বিস্তার লাভ করেছে ।

 

‘অউদ্রে লর্ড’, ‘ক্যারিবিয়ান-আমেরিকান লেখক ও চিন্তাবিদের মতে’, “ মনিবের হাতিয়ার কখনো মনিবের দুর্গে আঘাত হানেনা ” । গত ১০০ বছর ধরে এই একই হাতিয়ারই বিভিন্ন উপায়ে বাকি বিশ্বের উপর ব্যাবহার হয়েছে । তবে ‘শোষিত পৃথিবীর কণ্ঠে’ অনুরণিত কণ্ঠস্বরে সামনের দিনগুলোতে এই দুর্গে আঘাত হানার জন্য ‘নতুন হাতিয়ারে’র দাবী উচ্চকিত হচ্ছে । সেই কারনেই দুজন ‘অখ্যাত কূটনৈতিকের’ করা ‘অপরিণামদর্শী’ একটি মানচিত্র আজো “ওসমানী সাম্রাজ্য” পরবর্তী পৃথিবীতে সমান প্রাসঙ্গিক ।