অনুবাদ

মুসলিম বিশ্বে বই এবং পাঠাভ্যাসঃ একটি মারাত্মক সংকট
মুসলিম বিশ্বে বই এবং পাঠাভ্যাসঃ একটি মারাত্মক সংকট
অনুবাদ করেছেন তুহিন খান
০৯ নভেম্বর ২০১৫

হাতেম বাযিয়ান

কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ শব্দটি ছিলো একটি অনুজ্ঞাসূচক ক্রিয়া-পড়, এবং প্রথমদিকের আরও কয়েকটি আয়াতে পুনঃ পুনঃ এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মুসলমানদের মতে মানুশের জন্য সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ঐশীবাণী আল কুরআন বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, প্রথম আদেশটিতেই , ধর্ম পর্যন্ত পৌঁছা, তারসাথে যুক্ত হওয়া, তাকে জানা এবং বোঝার মূলভিত্তি ও পন্থা হিশেবে 'পড়া'-কেই কেন্দ্রীয় উপায় হিশেবে দেখানো হচ্ছে। পাঠই জ্ঞানার্জন এবং স্রষ্টা ও তার সৃষ্টিকে ভালোভাবে বোঝার চাবিকাঠি। এটা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয় যে, 'কুরআন' শব্দটিও একই শব্দমূল থেকে উত্পন্ন, যার অর্থ পড়া, বারবার পড়া বা আবৃত্তি করা। সুতরাং, ইসলামের সঠিক বোঝাবুঝিতেও 'পড়া'-ই একটা আলাদা ইবাদাত।

কুরআনের অন্যান্য নামগুলোর মধ্যে একটি হল 'আল কিতাব' বা 'বই', যদি প্রথম অবতীর্ণ শব্দ 'পড়'-র অনুষঙ্গে বিচার করা হয়, দেখা যাবে যে, 'পড়' ক্রিয়াটা ইসলাম এবং মুসলিম বিশ্বের মূল জ্ঞানতাত্ত্বিক বুনিয়াদ-সকল প্রকার জ্ঞান অর্জন, সংরক্ষণ এবং আদান প্রদানের একটি ঐশী নির্দেশ। বই হল জ্ঞান সংরক্ষণের উত্স, প্রাথমিক কেন্দ্রস্থল। বই মানুশের মনোদিগন্তকে ক্রমাগত প্রসারিত করার একটি মাধ্যম, পাঠের সাথে যুক্ত থাকার মধ্য দিয়েই যা মূর্ত হয়ে ওঠে। আমার বলার কথাটি হল-মুসলমানদের ভয়াবহরকম বিরাট একটি অংশে 'পড়া' একটি বিলুপ্ত শিল্পে পরিনত হয়েছে, এবং, সবধরনের বইয়ের সাহচার্য এখন একটি মৃতপ্রায় ব্যাপার। ফলতঃ হাতেগোনা অল্পকিছু পাঠক মুসলিম বিশ্বের হাল হাকীকতের সাথে সংযোগ রাখতে পারছে। পূর্বেকার সবগুলো ইসলামী সভ্যতায় বই এবং পাঠাভ্যাস ছিলো সম্মান ও মর্যাদার বিষয়।

"Knowledge Triumphant: The Concept of Knowledge in Medieval Islam" বইয়ের উপসংহারে ফ্রাঞ্জ রনসেন্থাল লিখেছেন-"জ্ঞানের ধারনা ইসলামে অভিনব বিজয়মাত্রা অর্জন করেছে।" গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, অতীতে জ্ঞানের এই সর্বোচ্চ সাফল্যমাত্রা অর্জিত হয়েছিল বইয়ের অপ্রতিরোধ্য প্রভাব এবং বিচিত্র ধরনের টেক্সটের সফল মর্মোদ্ধারের মধ্য দিয়ে, যার মধ্যে এমন বিষয়ও আছে যা ইসলামের বিশ্বাস ও ধারনার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। অনেকেই হয়ত ইন্টারনেট ও যোগাযোগের আধুনিক মাধ্যমগুলোর উদ্ভাবন এবং ছোট ও সংক্ষিপ্ত ভাষার ব্যবহার (Abbreviated Language) যেটা একটা সীমা পর্যন্ত বৈধ , এর ব্যাপকতার নিন্দা করবেন, কিন্তু সমস্যাটা আরো গভীর এবং ইন্টারনেট যুগেরও আগে থেকে চলে আসছে। পাঠাভ্যাস ত্যাগ এবং গ্রন্থবিযুক্তি এসবই অনেক অনেক আগে থেকে শুরু হয়েছে, যদি খুব বেশি আগে না ধরি, তাহলেও অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছে এবং যথারীতি এখনও চলছে।

এসবের কারণ অনেক। তবে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হল-আভ্যন্তরীণ অবক্ষয়, মিলিটারী ও কারিগরি জ্ঞানে একচেটিয়া আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও এসবে অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান, অর্থনৈতিক অবনতি ,ওয়াকফ (ধর্মীয় বৃত্তিমূলক সংগঠন) প্রতিষ্ঠানের পতন, যা ইসলামী সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের মেরুদণ্ড ছিলো এবং বিদ্বান, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাবৃত্তিকে সমাজের একপ্রান্তে নির্বাসিত করা। ধর্মীয় ওয়াকফ সংগঠনগুলোর ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় সরকারকর্তৃক এগুলোর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ এবং ওয়াকফ সংস্থাগুলোকে রাষ্টযন্ত্রের সাথে একীভূতকরণের কাজটা প্রথমে করা হয়েছিলো এগুলোর বিদ্যমান অর্থসংস্থানের পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিন্তু পরবর্তীতে এটা ওয়াকফ সংস্থাগুলোর বিপুল পরিমান উদ্বৃত্ত অর্থ আত্মসাতের পথ খুলে দেয়, যার ফলে পতনোন্মুখ রাষ্ট্রের রাজস্বে চুরিচামারি শুরু হয় এবং ক্ষমতার মধ্যে এসব দুর্নীতির তহবিল গড়ে ওঠে।

পাঠাভ্যাস যেকোন সমাজের উন্নতি ও অগ্রগতির পূর্বশর্ত, এবং পাঠবিযুক্তি এর উল্টোদিকে নিয়ে যায়। সবচে বড় সংকট হলো, বর্তমানে মুসলিমরা একটা ইণ্ডাস্ট্রি বা শিল্পোদ্যম আকারে বইপাঠ সম্মিলিতভাবে ছেড়ে দিয়েছে। সবধরনের জ্ঞান সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে শব্দগ্রাহক যন্ত্র, ডিভিডি, সরাসরি সম্প্রচার এবং ইউটিব লেকচারে। মনে হয় যেন আমাদের সভ্যতা অনলাইনে লাইক এবং শেয়ারের পরম্পরায় নেমে এসেছে, যা বই পড়ার কিংবা একাডেমিক জ্ঞানতাত্ত্বিক বিভাগ গড়ে তোলার কোন দায়ই অনুভব করেনা। অনেকে হয়ত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যেসব সংকটপূর্ণ ইস্যু সমাজকে প্রভাবিত করছে সেগুলোর প্রতি মানুশের মনোযোগ আকর্ষণের ব্যাপারে অনলাইনভিত্তিক এসব কাজের গুরুত্বকে মূল্য দেন, উত্সাহিত করেন, কিন্তু এই কাজগুলো বইপড়া বা সমাজের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি হিশেবে একটি গ্রন্থসংস্কৃতি গড়ে তোলার বিকল্প হতে পারেনা। এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৫৬ টি প্রকাশনা সংস্থার একটিও মুসলিম বিশ্বের না। এমনকি, কুরআন, বাইবেল বা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থবাদে , বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রীত ও পঠিত বইগুলিও মুসলিম বিশ্বের বা মুসলিম লেখকের লেখা নয়। ব্যক্তিগত চর্চা ও উদ্যোগের বাইরে সাধারণ পাঠাভ্যাস প্রায় নেই বললেই চলে। মুসলিম বিশ্বে একটি যুগসম্মত গ্রন্থসংস্কৃতির অভাব বর্তমানে একটি বড় সংকট এবং কাঠামোগত অজ্ঞতার কারণ, যা অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে।

 

এই সমস্যা নিরসনে প্রয়োজন জ্ঞানদীপ্ত নেতৃত্ব এবং এই মানসিকতা দূরীকরণে দীর্ঘসময়ের বহুমুখী পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় সংস্থান। এটা শুরু হতে পারে তরুণ সংগঠকদের দ্বারা পরিচালিত "পাঠচক্র" চালু করা এবং পাঠ প্রতিযোগীতার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে, যা প্রশাসনের উচ্চতর পর্যায়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। পাশাপাশি বই প্রকাশনা শিল্প এবং লেখকদের পেছনেও অর্থায়ন করতে হবে, এতে করে বইমেলার সংস্কৃতি তৈরী হবে যা মানুশের প্রতিভাকে বইমুখী করবে। বিশেষত, সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা নের পাঠব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা করতে হবে যাতে চাকরীর জন্য ডিগ্রী ও গ্রেড অর্জনই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য- এই প্রচলিত প্রবনতা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীরা বইপড়ে জ্ঞানার্জনের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। 'পড়' এটা সমগ্র জীবনব্যাপী শিক্ষার জন্য এবং নতুনকরে মুসলিম বিশ্বে একটি গ্রন্থসংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য ঐশী নির্দেশ।

 

অনুবাদকের নোটঃ লেখাটা এমন একসময় অনুবাদ করলাম যখন অত্যাচারের বিরুদ্ধে জ্ঞানতত্ত্বের আপাতঃপরাজয় স্বরুপ বই পোড়ানোর সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে। তবুও মনে হয় এতদিন বই পড়িনি বলেই আজ পোড়াতে হচ্ছে। লেখাটা সেই হিশেবে প্রাসঙ্গিক। লেখকের সব বক্তব্যের সাথে একমত নই।

মূল লেখা

তুহিন খান